
জাপানি
নাগরিক হোশি কুনিও হত্যা মামলায় ৫ জনের বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় ঘোষণা করেছে
আদালত। এই রায়কে ঘিরে গতকাল রংপুরের আদালত করা হয় কঠোর পুলিশি নিরাপত্তা।
সকাল থেকে মিডিয়া কর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষের ঢল নামে আদালত চত্বরে।
আদালতের কার্যক্রম শুরুর পূর্বে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে আসামিদের আদালতে
হাজির করা হয়। রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, আসামিরা ১৬৪ ধারা
জবানবন্দিতে স্পষ্টভাবে স্বীকার করেছেন তারা পূর্ব পরিকল্পনার অংশ হিসেবে
ধর্মকে ব্যবহার করে বিদেশি নাগরিক হত্যার ষড়যন্ত্রকে বাস্তবে রূপ দিতেই
২০১৫ সালের ৩রা অক্টোবর সকালে কাউনিয়ার আলুটারীতে জাপানি নাগরিক হোশি কুনিও
ঘাসের প্রকল্প পরিদর্শনে গেলে পথে জেএমবি সদস্যরা নাইন এমএম পিস্তল দিয়ে
গুলি করে হত্যা করে। মাত্র ৪৫ কার্যদিবসে বিচারিক কার্যক্রম শেষে আদালতের
বিচারক নরেশ চন্দ্র সরকার দেড়ঘণ্টা ধরে ৮০ পৃষ্ঠার রায়ে জেএমবি’র আঞ্চলিক
কমান্ডার মাসুদ রানা, সদস্য ইছাহাক আলী, লিটন মিয়া, সাখাওয়াত হোসেন ও আহছান
উল্যাহ আনছারীর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতিতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় তাদের ৫
জেএমবি সদস্যের ফাঁসির রায় প্রদান করেন। তবে আবু সাঈদের বিরুদ্ধে অভিযোগ
প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে বেকসুর খালাশ প্রদান করা হয়। এ রায়ে পুরোপুরি
সন্তুষ্ট নন বলে জানিয়েছেন সরকার পক্ষের কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট রথিশ চন্দ্র
ভৌমিক। তিনি বলেন, কেন একজনকে বেকসুর খালাস দেয়া হলো তা নথিপত্র দেখে উচ্চ
আদালতে আবেদন করবেন। সেই সঙ্গে আসামিরা ন্যায় বিচার পায়নি এমন অভিযোগ
আসামিপক্ষের আইনজীবী আবুল হোসেনের। তিনিও উচ্চ আদালতে আপিল করার কথা
জানিয়েছেন। রায় ঘোষণার সময় আহছান উল্যাহ আনছারী ছাড়া বাকিরা উপস্থিত ছিলেন।
এ মামলায় ২ জেএমবি সদস্য সাদ্দাম হোসেন ঢাকায় এবং নজরুল ইসলাম ওরফে বাইক
হাসান রাজশাহীতে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন।
ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্তসহ কারাগারে ৫
কারাগারে রয়েছেন ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি জেএমবি পীরগাছার আঞ্চলিক কমান্ডার পশুয়া টাঙ্গাইল পাড়ার মাসুদ রানা ওরফে মামুন মন্ত্রী (২১), একই এলাকার জেএমবি সদস্য ইসাহাক আলী (২৫), গাইবান্ধা সাঘাটার হলদিয়াচর এলাকার সাখাওয়াত হোসেন (৩২), বগুড়ার গাবতলী এলাকার জেএমবি সদস্য লিটন মিয়া ওরফে রফিক (২৩)। এছাড়া মামলায় খালাসপ্রাপ্ত আসামি পীরগাছার কালিগঞ্জ বাজারের জেএমবি সদস্য আবু সাঈদ (২৮)।
ফ্লাশব্যাক
ইতালিয়ান নাগরিক তাভেলা সিজারকে ঢাকায় গুলি করে হত্যার ৫ দিনের মাথায় ২০১৫ সালের ৩রা অক্টোবর রংপুর নগরীর অদূরে কাউনিয়া উপজেলার ১নং সারাই ইউনিয়নের নাছনিয়া বিল সংলগ্ন আলুটারী গ্রামে ৩ দুর্বৃত্ত জাপানি নাগরিক হোশি কুনিওকে বুকে ও ঘাড়ে গুলি করে প্রেস লেখা লাল রঙের পালসার মোটরসাইকেলে পালিয়ে যায়। তাৎক্ষণিকভাবে তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয় হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এ সংবাদ চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে দেশ-বিদেশে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়। তৎপর হয়ে ওঠে র্যাব-পুলিশ, গোয়েন্দাসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ঘটনাস্থল পুলিশ, র্যাব, গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পরিদর্শন করেন। নিরাপত্তা বেষ্টনীতে ঘিরে রাখা হয় ঘটনাস্থল। দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত কুনিওকে মর্গের হিমঘরে রাখা হয়। জাপান থেকে বিশেষ টিম এসে কুনিওর লাশ পর্যবেক্ষণ করেন। সেই সঙ্গে তার মুসলমান হওয়ার প্রমাণ পেয়ে লাশ গ্রহণ না করে ফিরে যান। লাশ ঢাকা ও জাপানে নিয়ে যাওয়ার নানা নাটকীয়তা পর কাঠোর গোপনীয়তার মধ্যে ১১ দিনের মাথায় ওই বছরের ১২ অক্টোবর দিবাগত মধ্যরাতে মুন্সিপাড়া কবরস্থানে মুসলিম শরীয়াহ মোতাবেক দাফন করা হয়।
যারা গ্রেপ্তার
এদিকে ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে পুলিশ বাড়ির মালিক জাকারিয়া বালা, ব্যবসার পার্টনার হুমায়ন কবির হীরা, রিকশাচালক মোন্নাফ ও আলুটারী এলাকার মুরাদ নামে ৪ ব্যক্তিকে আটক ও জিজ্ঞাসাবাদ করে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের কয়েকদিন পর বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেলের ছোট ভাই চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি রাশেদ উন নবী খান বিপ্লবকে তার গুপ্তপাড়াস্থ বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর জেলা বিএনপির সংগঠনিক সম্পাদক আনিসুর রহমান লাকুসহ একে একে গ্রেপ্তার করা হয় যুবদলের সদস্য রাজিব হাসান ওরফে মেরিল সুমন, নওশাদ হোসেন ওরফে কালা রুবেল এবং কাজল চন্দ্র বর্মন ওরফে কাজল, ব্র্যাক ব্যাংক কর্মকর্তাকে হিরার খালাতো ভাই সুইটসহ ১৮ জনকে। আলোচিত জাপানি নাগরিক হত্যায় সন্দেহের তীর থাকে বিএনপি ও জামায়াতের দিকে। পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিএনপি নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারের বিষয় অস্বীকার করলে তাদের পরিবার থেকে সংবাদ সম্মেলন করা হয়। কিন্তু জেএমবির কিলিং লিডার মাসুদ রানা গ্রেপ্তার হয়ে স্বীকারোক্তি দিলে তদন্তের মোড় ঘুরে যায়। একে একে বেরিয়ে আসতে থাকে এ হত্যাকাণ্ডসহ ওই অঞ্চলের বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডে জেএমবির সম্পৃক্ততা। পুলিশ অভিযুক্ত ৫ খুনিকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।
যেভাবে হত্যা করা হয়
আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে মাসুদ রানা জানায়, জেএমবিতে যোগদানের পর সক্রিয় ভূমিকার কারণে তাকে রংপুরের পীরগাছা থানার দায়িত্ব দেয়া হয়। সে তার এলাকায় সহযোগী এছাহাক আলীকে নিয়ে সেখানে জেএমবি সংগঠনের কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল। ৩রা অক্টোবর সকাল ৯টার দিকে নবীগঞ্জে রেলক্রসিং গিয়ে অপেক্ষা করার পর কিছুক্ষণের মধ্যে হাসান ও বিজয় একটি লাল রঙের টিভিএস মোটরসাইকেল নিয়ে তার কাছে আসে। এরপর তারা তিনজনই ওই মোটরসাইকেলে ওঠেন। বাইক হাসান মোটরসাইকেল চালায় এবং মাসুদ রানা মোটরসাইকেলের মাঝখানে বসে। জাপানি নাগরিক কাঁচা রাস্তায় এলে মাসুদ রানা তার কোমর থেকে পিস্তল বের করে কুনিওকে রিকশায় বসা অবস্থায় দুই রাউন্ড গুলি করে। প্রথম গুলিটি তার গলার বাম দিকে লাগে, দ্বিতীয় গুলিটি তার মাথা লক্ষ্য করে ছুড়লেও পিস্তল থেকে গুলি বের না হয়ে আটকে যায়। তখন বিজয় তার হাতে থাকা পিস্তল দিয়ে পর পর কয়েক রাউন্ড গুলি করলে কুনিও মাটিতে পড়ে নিহত হন। হোশি কুনিওকে হত্যা করার মূল কারণ হিসেবে মাসুদ রানা জানায়, বিদেশিদের হত্যা করলে দেশে বিদেশি বিনিয়োগ কমে আসবে। বিদেশিদের আস্থা হারিয়ে যাবে এদেশের প্রতি। বন্ধ হয়ে যাবে তাদের অর্থ সহযোগিতা। ফলে সরকার পড়বে বিপাকে। বিদেশি নাগরিকদের হত্যার মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করার লক্ষ্য ছিল তাদের। দেশকে অস্থিতিশীল করতে পারলে দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়বে এবং তখন দেশে অভ্যুত্থান করা সহজ হবে বলে বিদেশিদের হত্যা করার পরিকল্পনা করা হয়। এরই অংশ হিসেবে জঙ্গি সাদ্দাম রংপুরে অবস্থান করে জাপানি নাগরিক কুনিও হোশিকে হত্যার টার্গেট করে। মাসুদ রানা জানান, তিনিসহ সাদ্দাম, বিজয়, হাসান ও আহসান উল্লাহ আনছারী মিলে সিদ্ধান্ত নিয়ে জাপানি নাগরিককে হত্যার পরিকল্পনা করেন।
রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলির প্রতিক্রিয়া
রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট রথিশ চন্দ্র ভৌমিক বাবু সোনা বলেন, ৫ জন আসামি মাসুদ রানা, ইসাহাক, লিটন, সাখাওয়াত, আহসান উল্লাহকে আদালত মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। আবু সাঈদকে এ মামলায় খালাস দেয়া হয়েছে। আমরা এ ব্যাপারে বিজ্ঞ আদালতের রায় পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবো। তদন্ত কর্মকর্তা যেভাবে প্রতিবেদন করার কথা ছিল সেভাবে না আসায় আবু সাঈদকে খালাস দেয়া হয়। তবে এ রায় সন্তোষজনক। দেশকে অস্থিতিশীল করতে পরিকল্পিতভাবে জেএমবি কার্যক্রমকে বিস্তৃত করার জন্য জাপানি নাগরিককে হত্যা করা হয়েছে। তারা এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিল।
আসামিপক্ষের আইনজীবীর প্রতিক্রিয়া
আসামিপক্ষের আইনজীবী আবুল হোসেন বলেন, এ রায়ে আসামিরা ক্ষুব্ধ এবং ন্যায়্য বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এই রায়ের কপি সংগ্রহ করে নথি পর্যালোচনা করে উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে। সেখানে ন্যায় বিচার পাবো বলে আশা করছি।
মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিক্রিয়া
ইউনিটি ফর ইউনিভার্স হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ রংপুর বিভাগীয় কমিটির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সিরাজুল কবীর ও মহাসচিব মোজাক্কের হোসেন মঞ্জু তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, একজন বিদেশি নাগরিক হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে দেশের সামাজিক অবস্থা অস্থির করতে যারা এ অমানবিক কাজ করেছে, মৃত্যুদণ্ড তাদের উপযুক্ত শাস্তি। এ রায়ের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হলো দেশে সুষ্ঠু বিচার আছে। অন্যায়কারী যত শক্তিশালী হোক ন্যায়ের কাছে তাদের মাথানত করতেই হবে।
আইনজীবী সমিতি সম্পাদকের প্রতিক্রিয়া
গণতন্ত্রী পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য আরশাদ হারুন রায়ের প্রতি সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, রংপুরের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করেছে। এ থেকে একটি বার্তা সকলের কাছে পৌঁছাবে, কোনো ব্যক্তি যত গোপনভাবে হত্যাকাণ্ড করুক বা যত শক্তিশালী হোক, তাদের আইনের আওতায় আসতেই হবে। রায়ের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে বাংলাদেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিদেশি মানুষের জানমাল নিরাপত্তা দিতে দেশের সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর রয়েছে। রায়টি দ্রুত কার্যকর করার দাবি জানান তিনি।
ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্তসহ কারাগারে ৫
কারাগারে রয়েছেন ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি জেএমবি পীরগাছার আঞ্চলিক কমান্ডার পশুয়া টাঙ্গাইল পাড়ার মাসুদ রানা ওরফে মামুন মন্ত্রী (২১), একই এলাকার জেএমবি সদস্য ইসাহাক আলী (২৫), গাইবান্ধা সাঘাটার হলদিয়াচর এলাকার সাখাওয়াত হোসেন (৩২), বগুড়ার গাবতলী এলাকার জেএমবি সদস্য লিটন মিয়া ওরফে রফিক (২৩)। এছাড়া মামলায় খালাসপ্রাপ্ত আসামি পীরগাছার কালিগঞ্জ বাজারের জেএমবি সদস্য আবু সাঈদ (২৮)।
ফ্লাশব্যাক
ইতালিয়ান নাগরিক তাভেলা সিজারকে ঢাকায় গুলি করে হত্যার ৫ দিনের মাথায় ২০১৫ সালের ৩রা অক্টোবর রংপুর নগরীর অদূরে কাউনিয়া উপজেলার ১নং সারাই ইউনিয়নের নাছনিয়া বিল সংলগ্ন আলুটারী গ্রামে ৩ দুর্বৃত্ত জাপানি নাগরিক হোশি কুনিওকে বুকে ও ঘাড়ে গুলি করে প্রেস লেখা লাল রঙের পালসার মোটরসাইকেলে পালিয়ে যায়। তাৎক্ষণিকভাবে তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয় হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এ সংবাদ চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে দেশ-বিদেশে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়। তৎপর হয়ে ওঠে র্যাব-পুলিশ, গোয়েন্দাসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ঘটনাস্থল পুলিশ, র্যাব, গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পরিদর্শন করেন। নিরাপত্তা বেষ্টনীতে ঘিরে রাখা হয় ঘটনাস্থল। দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত কুনিওকে মর্গের হিমঘরে রাখা হয়। জাপান থেকে বিশেষ টিম এসে কুনিওর লাশ পর্যবেক্ষণ করেন। সেই সঙ্গে তার মুসলমান হওয়ার প্রমাণ পেয়ে লাশ গ্রহণ না করে ফিরে যান। লাশ ঢাকা ও জাপানে নিয়ে যাওয়ার নানা নাটকীয়তা পর কাঠোর গোপনীয়তার মধ্যে ১১ দিনের মাথায় ওই বছরের ১২ অক্টোবর দিবাগত মধ্যরাতে মুন্সিপাড়া কবরস্থানে মুসলিম শরীয়াহ মোতাবেক দাফন করা হয়।
যারা গ্রেপ্তার
এদিকে ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে পুলিশ বাড়ির মালিক জাকারিয়া বালা, ব্যবসার পার্টনার হুমায়ন কবির হীরা, রিকশাচালক মোন্নাফ ও আলুটারী এলাকার মুরাদ নামে ৪ ব্যক্তিকে আটক ও জিজ্ঞাসাবাদ করে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের কয়েকদিন পর বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেলের ছোট ভাই চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি রাশেদ উন নবী খান বিপ্লবকে তার গুপ্তপাড়াস্থ বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর জেলা বিএনপির সংগঠনিক সম্পাদক আনিসুর রহমান লাকুসহ একে একে গ্রেপ্তার করা হয় যুবদলের সদস্য রাজিব হাসান ওরফে মেরিল সুমন, নওশাদ হোসেন ওরফে কালা রুবেল এবং কাজল চন্দ্র বর্মন ওরফে কাজল, ব্র্যাক ব্যাংক কর্মকর্তাকে হিরার খালাতো ভাই সুইটসহ ১৮ জনকে। আলোচিত জাপানি নাগরিক হত্যায় সন্দেহের তীর থাকে বিএনপি ও জামায়াতের দিকে। পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিএনপি নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারের বিষয় অস্বীকার করলে তাদের পরিবার থেকে সংবাদ সম্মেলন করা হয়। কিন্তু জেএমবির কিলিং লিডার মাসুদ রানা গ্রেপ্তার হয়ে স্বীকারোক্তি দিলে তদন্তের মোড় ঘুরে যায়। একে একে বেরিয়ে আসতে থাকে এ হত্যাকাণ্ডসহ ওই অঞ্চলের বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডে জেএমবির সম্পৃক্ততা। পুলিশ অভিযুক্ত ৫ খুনিকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।
যেভাবে হত্যা করা হয়
আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে মাসুদ রানা জানায়, জেএমবিতে যোগদানের পর সক্রিয় ভূমিকার কারণে তাকে রংপুরের পীরগাছা থানার দায়িত্ব দেয়া হয়। সে তার এলাকায় সহযোগী এছাহাক আলীকে নিয়ে সেখানে জেএমবি সংগঠনের কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল। ৩রা অক্টোবর সকাল ৯টার দিকে নবীগঞ্জে রেলক্রসিং গিয়ে অপেক্ষা করার পর কিছুক্ষণের মধ্যে হাসান ও বিজয় একটি লাল রঙের টিভিএস মোটরসাইকেল নিয়ে তার কাছে আসে। এরপর তারা তিনজনই ওই মোটরসাইকেলে ওঠেন। বাইক হাসান মোটরসাইকেল চালায় এবং মাসুদ রানা মোটরসাইকেলের মাঝখানে বসে। জাপানি নাগরিক কাঁচা রাস্তায় এলে মাসুদ রানা তার কোমর থেকে পিস্তল বের করে কুনিওকে রিকশায় বসা অবস্থায় দুই রাউন্ড গুলি করে। প্রথম গুলিটি তার গলার বাম দিকে লাগে, দ্বিতীয় গুলিটি তার মাথা লক্ষ্য করে ছুড়লেও পিস্তল থেকে গুলি বের না হয়ে আটকে যায়। তখন বিজয় তার হাতে থাকা পিস্তল দিয়ে পর পর কয়েক রাউন্ড গুলি করলে কুনিও মাটিতে পড়ে নিহত হন। হোশি কুনিওকে হত্যা করার মূল কারণ হিসেবে মাসুদ রানা জানায়, বিদেশিদের হত্যা করলে দেশে বিদেশি বিনিয়োগ কমে আসবে। বিদেশিদের আস্থা হারিয়ে যাবে এদেশের প্রতি। বন্ধ হয়ে যাবে তাদের অর্থ সহযোগিতা। ফলে সরকার পড়বে বিপাকে। বিদেশি নাগরিকদের হত্যার মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করার লক্ষ্য ছিল তাদের। দেশকে অস্থিতিশীল করতে পারলে দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়বে এবং তখন দেশে অভ্যুত্থান করা সহজ হবে বলে বিদেশিদের হত্যা করার পরিকল্পনা করা হয়। এরই অংশ হিসেবে জঙ্গি সাদ্দাম রংপুরে অবস্থান করে জাপানি নাগরিক কুনিও হোশিকে হত্যার টার্গেট করে। মাসুদ রানা জানান, তিনিসহ সাদ্দাম, বিজয়, হাসান ও আহসান উল্লাহ আনছারী মিলে সিদ্ধান্ত নিয়ে জাপানি নাগরিককে হত্যার পরিকল্পনা করেন।
রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলির প্রতিক্রিয়া
রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট রথিশ চন্দ্র ভৌমিক বাবু সোনা বলেন, ৫ জন আসামি মাসুদ রানা, ইসাহাক, লিটন, সাখাওয়াত, আহসান উল্লাহকে আদালত মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। আবু সাঈদকে এ মামলায় খালাস দেয়া হয়েছে। আমরা এ ব্যাপারে বিজ্ঞ আদালতের রায় পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবো। তদন্ত কর্মকর্তা যেভাবে প্রতিবেদন করার কথা ছিল সেভাবে না আসায় আবু সাঈদকে খালাস দেয়া হয়। তবে এ রায় সন্তোষজনক। দেশকে অস্থিতিশীল করতে পরিকল্পিতভাবে জেএমবি কার্যক্রমকে বিস্তৃত করার জন্য জাপানি নাগরিককে হত্যা করা হয়েছে। তারা এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিল।
আসামিপক্ষের আইনজীবীর প্রতিক্রিয়া
আসামিপক্ষের আইনজীবী আবুল হোসেন বলেন, এ রায়ে আসামিরা ক্ষুব্ধ এবং ন্যায়্য বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এই রায়ের কপি সংগ্রহ করে নথি পর্যালোচনা করে উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে। সেখানে ন্যায় বিচার পাবো বলে আশা করছি।
মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিক্রিয়া
ইউনিটি ফর ইউনিভার্স হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ রংপুর বিভাগীয় কমিটির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সিরাজুল কবীর ও মহাসচিব মোজাক্কের হোসেন মঞ্জু তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, একজন বিদেশি নাগরিক হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে দেশের সামাজিক অবস্থা অস্থির করতে যারা এ অমানবিক কাজ করেছে, মৃত্যুদণ্ড তাদের উপযুক্ত শাস্তি। এ রায়ের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হলো দেশে সুষ্ঠু বিচার আছে। অন্যায়কারী যত শক্তিশালী হোক ন্যায়ের কাছে তাদের মাথানত করতেই হবে।
আইনজীবী সমিতি সম্পাদকের প্রতিক্রিয়া
গণতন্ত্রী পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য আরশাদ হারুন রায়ের প্রতি সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, রংপুরের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করেছে। এ থেকে একটি বার্তা সকলের কাছে পৌঁছাবে, কোনো ব্যক্তি যত গোপনভাবে হত্যাকাণ্ড করুক বা যত শক্তিশালী হোক, তাদের আইনের আওতায় আসতেই হবে। রায়ের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে বাংলাদেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিদেশি মানুষের জানমাল নিরাপত্তা দিতে দেশের সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর রয়েছে। রায়টি দ্রুত কার্যকর করার দাবি জানান তিনি।
>>>মানবজমিন
No comments:
Post a Comment