Monday, April 24, 2017

সব হারিয়ে নিঃস্ব লাখ লাখ কৃষক



আর ক’দিন পরেই কৃষকের ঘরে উঠতো সোনাফলা ফসল। কিন্তু তার আগেই ভারি বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে গেছে হাওরের আধা-কাঁচা ধান। পানির নিচের কাঁচা ধান পচে সৃষ্ট গ্যাসে মরে গেছে হাওরের মাছ। এরপর মারা গেছে হাঁস-পাখিসহ হাওরের বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী। ফের গত ক’দিনের টানা ভারি বর্ষণে ডুবছে নতুন নতুন এলাকার ফসল। সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে হাওরপাড়ের কৃষকরা। হাওরজুড়ে এখন হাহাকার আর আর্তনাদ। জীবিকার সন্ধানে কৃষকরা ছুটছেন শহরে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত ৩ লাখ ৩০ হাজার পরিবারকে প্রতিমাসে ৩০ কেজি চাল ও ৫০০ টাকা দেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এদিকে হাওরের দূষিত পানি পরীক্ষা করতে   সুনামগঞ্জে যান বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল। পরীক্ষায় হাওরের পানিতে ইউরেনিয়ামের তেজস্ক্রিয়তার কোনো আলামত পাননি বলে জানান তারা। ওদিকে কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলের ফসলডুবিতে ৮০৫ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক।
তলিয়ে গেল শনির হাওরঃ পানিতে মেলেনি তেজস্ক্রিয়তা
শেষ রক্ষা হলো না সর্ববৃহৎ বোরো ফসলের ভাণ্ডার শনি হাওরের। গত দুই সপ্তাহ ধরে নারী-পুরুষ মিলে শনির হাওরের বাঁধ রক্ষায় অক্লান্ত পরিশ্রম নিমিষেই ভেঙে তলিয়ে গেল। হাওরের কৃষক-কৃষাণির কান্নায় আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠে। শনির হাওরের তলিয়ে যাবার খবরে সারা জেলার মানুষের মধ্যে স্থবিরতা দেখা দেয়। এরকম দুর্যোগ তাদের জীবনে আর দেখেন নি বলে জানান, তাহিরপুরের কাকনদি গ্রামের কৃষক আনিসুল ও কৃষাণি রহিমা বেগম। তারা জানান, রাতদিন শনির বিভিন্ন বাঁধে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কাজ করেও ফসল রক্ষা করতে না পারার কষ্ট সারাজীবন মনে থাকবে।  
শনিবার গভীর রাতে শনি হাওরের লালুর গোয়ালা বাঁধ ভেঙে হাওরের ভেতরে পানি প্রবেশ করে তলিয়ে গেছে শনি হাওরের প্রায় ৮ হাজার হেক্টর আধা পাকা বোরো ধান। অতিবৃষ্টিপাত আর উজান থেকে আসা পানিতে সবগুলো হাওর তলিয়ে গেলেও একমাত্র কৃষকের সম্বল ছিল শনি হাওরের বোরো ধান। বাঁধ রক্ষার্থে হাওর পাড়ের শত শত কৃষক গত ২৬ দিন ধরে শনি হাওরের প্রত্যেকটি বাঁধে দিন-রাত পরিশ্রম করেও শেষ রক্ষা করতে পারেনি। কৃষক সোনা মিয়া জানান, কিছু ধান কাটার উপযুক্ত হলেও শ্রমিকের মজুরি বেশি হওয়ায় অনেক কৃষকই হাওর পাড়ের ধানগুলো কাটতে পারছেন না। যার ফলে দিনের আলোতেই কৃষকের চোখের সামনে পানিতে ডুবছে সারা বছরের জীবিকার একমাত্র  সোনালি বোরো ফসল। শনির হাওর পারের ভাটি তাহিরপুর গ্রামের কৃষক সামায়ুন কবির বলেন, বাঁধ  ভেঙে যাওয়ার খবর পেয়ে ধান কাটতে হাওরে গিয়েছিলাম, কিন্তু দেখতে দেখতে জমির ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে।  তাহিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুছ ছালাম বলেন, শনি হাওরের বাঁধ ভেঙে প্রায় ৮ হাজার হেক্টর বোরো জমির আধা পাকা ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। যেখানে ১৫ হাজার টন ধান উৎপাদন হতো। যার মূল্য প্রায় ১শ’ ২৩ কোটি টাকা।  
পানিতে তেজস্ক্রিয়তা পাওয়া যায়নি: বিভিন্ন হাওরে মাছ মরে ভেসে ওঠার ঘটনায় সুনামগঞ্জে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের তিন সদস্যের প্রতিনিধি দল সরজমিন হাওর সহ সীমান্তবর্তী নদী ও হাওর পরিদর্শন করে প্রাথমিক ভাবে পানি পরীক্ষা করে ইউরেনিয়ামের কোনো আলামত পান নি। এমনটি জানিয়েছেন, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের ফিজিক্যাল সায়েন্স অ্যাটোনমিক কমিশনের সদস্য ড. দিলীপ কুমার সাহা। তিনি জানান ‘প্রাথমিক ভাবে  ধারণা করছেন হাওরের পানিতে ইউরেনিয়ামের তেজস্ক্রিয়তার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওর থেকে বিভিন্ন প্রকার পানি, মরা মাছ ও মরা হাঁসের নমুনা সংগ্রহ করে তাদের আরো একটি দল ঢাকায় নিয়ে গেছে। সেখানে ল্যাব টেস্টের পর নিশ্চিত ভাবে বলা যাবে এই পানিতে আসলেই কোনো ইউরেনিয়াম আছে কি-না। পরমাণু  প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আরো ছিলেন বাংলাদেশ অ্যাটোনমিক এনার্জি কমিশনের প্রধান সায়েন্টিফিক অফিসার ড. দেবাশীষ পাল ও বাংলাদেশ ক্যামিস্টি ডিভিশনের হেড ড. বিলকিস আরা বেগম।

No comments:

Post a Comment